অনিন্দ্য আফরোজ
শামস তাবরিজি বা শামস আল দিন মোহাম্মদ ছিলেন একজন ইরানি সুফি সাধক।নির্জনতাপ্রিয় এই জ্ঞানতাপস জীর্ণ পোশাকে ঘুরে বেড়াতেন একা। শামস তাবরিজি সম্পর্কে আজো বিশ্ব ইতিহাসে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তেমন পাওয়া যায় না। মূলত, তিনি এমন এক সত্ত্বা যিনি নিজেকে নিজের মধ্যাদয়ে বিকশিত করতে চাননি। তিনি প্রকাশিত হয়েছিলেন তাঁর শিষ্য এবং পরম বন্ধু সুফি সাহিত্যিক,দার্শনিক কবি জালালউদ্দীন রুমীর মধ্যদিয়ে। আত্মার কবি রুমীর রচনার মাধ্যমে শামস তাবরিজির নাম মানুষ জানতে পারে।
রুমি যখন তুরস্কের কোনিয়ায় মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন তখন বিশ্বব্যাপী হজরত জালাল উদ্দীন রুমির নাম ছড়িয়ে পড়ে। তিনিও আধ্যাত্মিক এক মহাজ্ঞানী।একদিন রুমীর সঙ্গে এক জীর্ণ পোশাকধারী ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেলেন। সেই ব্যক্তি রুমীকে প্রশ্ন করেছিলেন— হে রুমি, ইমানের সংজ্ঞা কী? রুমি নানাভাবে তাকে ইমানের সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু জীর্ণ পোশাকধারী ব্যক্তি তাঁর উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পেরে বললেন, রুমি, ইমানের সংজ্ঞা হলো, ‘নিজের থেকে নিজেকে পৃথক করে ফেলা।’ ওইদিন রুমির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ঘটনাটি ঘটে ১২৪৪ সালে। উত্তর শুনে তাবরিজির সঙ্গে এক অনন্যসাধারণ বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়েন রুমি।কবি, লেখক ব্র্যাড গুচ বলেন, ‘মাত্র তিন বছর স্থায়ী এই সম্পর্কে তাবরিজি ও রুমি কি কেবল গুরু-শিষ্যই ছিলেন, নাকি একে অন্যের সঙ্গে আরো গভীর কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, তা আজো স্পষ্ট হয়নি। মাত্র তিন বছর ছিল এই গভীর বন্ধুত্ব। এরপর তাবরিজি নিরুদ্দেশ হন। কথিত আছে, রুমির এক ছেলেই তাঁকে হত্যা করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বিচ্ছেদ সম্পর্কে শিক্ষা দিতেই রুমির কাছ থেকে নিরুদ্দেশ হন তাবরিজি।
আরো পড়ুন….জালালউদ্দীন রুমীঃ আত্মার কবি
তাবরিজির নিরুদ্দেশের পর বিচ্ছেদের বিষাদে ভেঙে পড়েন রুমী। তিনি এই বিচ্ছেদের সাগরে নিমজ্জিত হতে থাকেন এবং অন্তরের চোখ দিয়ে ভালবাসার মহাসমুদ্রে উপনীত হন তিনি।তাবরিজির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিন দশক ধরে রুমি কাব্য, গীতি ও নৃত্যকে ধর্মীয় চর্চায় আত্তীকরণ করেন। ঘূর্ণিনৃত্যে পাক খেতে খেতে ধ্যান করতেন, মুখে মুখে কবিতা রচনা করে ফিরতেন। তাঁর এই অসাধারণ দরদী ভালবাসার মাখনে আচ্ছাদিত কাব্যের জন্য তিনি আনন্দ ও ভালোবাসার কবি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন।
জ্যাক ক্যারোয়াক স্কুল অব ডিজএমবডিড পোয়েটিকস বিভাগের কাব্যতত্ত্বের অধ্যাপক লেখক গবেষক ও কবি ব্র্যাড গুচ বলেন, ‘শামসের সঙ্গে বিচ্ছেদ মোকবিলা, ভালোবাসা, সৃষ্টির উৎস এবং বিলয় আর মৃত্যু নিয়ে ভাবনা থেকেই তাঁর কবিতা জন্ম নিয়েছে। তিনি বলেন,‘রুমি আমাদের সময়ের খুবই ভাবনা-জাগানিয়া ও রহস্যময় কবি। বিশেষ করে যখন আমরা সুফি ঐতিহ্য, পরমানন্দ ও সাধনার প্রকৃতি এবং কবিতার শক্তি বোঝবার চেষ্টা করছি।’
অনেকে বিশ্বাস করেন, হজরত শামস তাবরিজির সঙ্গে খাজা কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকির আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল। জালালউদ্দিন রুমি যখন হযরত শামস তাবরিজির সংস্পর্শে এসে সংসারের প্রতি উদাসীন হয়ে গেলেন, তখন সবাই এজন্য পরিব্রাজক হযরত শামসকে দায়ী করলেন। আর এজন্যেই শামসকে হত্যা করা হয়েছিল।
জালালউদ্দিন রুমি তাঁর বিখ্যাত ‘দিওয়ান-ই শামস তাবরেজ’ গ্রন্থে তাঁর গুরুকে হারানোর যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করেছেন। গুরু-শিষ্যের মধ্যে পবিত্র আধ্যাত্মিক বন্ধন ভেঙে গেলে একজন প্রেমিক শিষ্য কী যন্ত্রণা ভোগ করেন তার বর্ণনা পাওয়া যায়। একই যন্ত্রণার কথা তিনি ‘মালাকাতে শামসে তাবরিজ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
শামস তাবরিজি সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ছিলেন ওই সময়ের আধ্যাত্মিক সম্রাট। তিনি ছিলেন নির্জনতা প্রিয় এবং একা । পরিব্রাজক ছিলেন বলে তাকে পারিন্দা বলা হতো। তিনি এক জায়গায় স্থির থাকতেন না।
আরো পড়তে পারেন সত্যদ্রষ্টা দার্শনিক সক্রেটিস…
যতদূর জানা যায়, শামস তাবরিজি ১১৮৫ সালে ইরানে জন্মেছিলেন।১২৪৮ সালে ইরানের খৈয় এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
রুমির সঙ্গে যখন শামস তাবরিজির পরিচয় হয় তখন তাবরিজির বয়স ষাটের কোঠায়। তাবরিজি একধরনের সমাজ-বিরোধী এবং জেদি মানুষ ছিলেন। তবে বিস্ময়করভাবে তাবরিজি ছিলেন খুবই শক্তিশালী এক আধ্যাত্মিক পুরুষ। তাঁকে লোকে ‘পাখি’ বলে ডাকতেন।মানুষের বিপুল কৌতূহল ছিল তাঁকে নিয়ে। খুবই রহস্যঘেরা ছিল তাঁর জীবন। এর কারণ, তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকতেন না। দ্রুত অন্যত্র চলে যেতেন। মনে হতো তিনি যেন কী খুঁজছেন, কাকে যেন খুঁজছেন। তিনি সবসময় একজন পরম জ্ঞানী শিষ্য খুঁজতেন। তাঁর একজন যোগ্য উত্তরসূরি প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত রুমির মধ্যে সেই গুণ খুঁজে পা্ওয়ার পর বোঝা গেল আসলেই তাবরিজি কি খুঁজছিলেন।
তাবরিজি ছিলেন গৃহহীন এক জীর্ণ মানুষ। তার ওপরে মারাত্মকভাবে সমাজ-বিরোধী ছিলেন।তিনি এতটাই মেজাজি ছিলেন যে, শিশুদের কাছে তিনি রীতিমতো আতঙ্ক ছিলেন। তবে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তিমত্তা ছিল অসাধারণ। কিন্তু তাঁর কাছে বিপরিত জীবন ধারণকারী রুমি কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন এটা এক বড় রহস্য!
জানা যায়, রুমির ব্যক্তিত্ব ছিল সাংঘাতিক আকর্ষণীয়। ধীরে ধীরে তাবরিজির কাছে রুমির অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে আকর্ষিত হন তাবরিজি। অন্যদিকে তাবরিজির গতিবিধি, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিগত অবস্থান, ধর্ম-কর্ম কোনোকিছুই চলমান সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একপর্যায়ে তাবরিজিকে তাঁর ধর্ম-কর্মের জন্য হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে রুমীর সংস্পর্শ ত্যাগ করে শহর ছাড়তে বলা হলো, না হয় হত্যারা হুমকি দেওয়া হয়। বস্তুত, তাবরিজির প্রতি অতল ভালবাসা এবং নিজের এলাকায় আশ্রয় দেওয়ায় ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েন রুমি। এমন সংকটে শেষ পর্যন্ত তাবরিজিকে কোনিয়ায় ফিরে যেতে হয়েছিল।
তবে প্রথাগত সংস্কৃতির ভয়ে শিষ্য রুমি মোটেই দমেননি । কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন মাত্র। সামাজিক সীমাবদ্ধতার তুলনায় রুমি তাঁর শক্তির ব্যাপারে পুরোপুরি সচতেন ছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, তাবরিজিকে তাঁর পরিবারে তাঁর সমাজে যে করেই হোক স্থান দেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রুমি তাঁর মেয়ে কিমিয়াকে শামস তাবরিজির সঙ্গে বিয়ে দেন।
তখন কিমিয়ার বয়স মাত্র পনেরো। কথিত আছে, কিমিয়ার সঙ্গে বিয়ের পরই তাবরিজি জীবনে প্রথম প্রেমে পড়েন।এতে রুমির প্রতি তাবরিজি আরো বিস্মিত, মুগ্ধ হন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে শিষ্যের কন্যাকে বিয়ের ঘটনা তাঁর জীবনে এক স্মরণীয় মুহূর্ত। বিয়ের মাত্র কয়েক মাস পর কিমিয়া হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী বিয়োগের বিষয়টি গভীর আঘাত হানে তাঁর জীবনে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাবরিজির সঙ্গে রুমীর সম্পর্কের প্রায় ছেদ ঘটে।
কথিত আছে, কিমিয়ার মৃত্যুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাবরিজি অদৃশ্য হন। এভাবে তাবরিজি রহস্যময় হয়ে গেলেন, হারিয়ে গেলেন নাকি কোনো পক্ষ তাঁকে গুপ্ত-হত্যার মাধ্যমে দুনিয়া থেকে অদৃশ্য করে ফেলেছিল- এমন গুঞ্জন ওই সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ।
শামস তাবরিজির কিছু বাণী
‘অতীত আমাদের মনে ঘন কুয়াশার মত। আর ভবিষ্যত? সম্পূর্ণ একটা স্বপ্ন। আমরা ভবিষ্যত কেমন হবে তা ধারণাই করতে পারি না, যেমন পারিনা অতীতকে বদলে দিতে’।
‘যখন সবাই কিছু একটা হতে চাইছে, তখন তুমি বরং কিছুই হতে যেয়ো না। শূণ্যতার সীমানায় নিজেকে মেলে দাও। মানুষের উচিত একটা পাত্রের মতন হওয়া। একটি পাত্রের মধ্যকার শূণ্যতা যেমন তাকে ধরে রাখে, তেমনি একজন মানুষকে ধরে থাকে তার নিজের কিছুই না হয়ে থাকার সচেতনতা’
‘লোকের ছলচাতুরি আর প্রতারণা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না। কিছু লোক যদি তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং তোমাকে কষ্ট দিতে চায়, তবে আল্লাহও তো তাদের জন্য কৌশল করছেন। যারা ফাঁদ পাতে তারা তাদের নিজেদের পাতা ফাঁদেই পড়ে যায়। কোন খারাপ কাজই শাস্তিবিহীন থাকে না, কোন ভালো কাজই পুরষ্কার ছাড়া যায় না। ন্যায়বিচারের উপরে বিশ্বাস রাখো এবং বাকিটা ছেড়ে দাও’।
‘শেখার জন্য তুমি পড়াশোনা করো, কিন্তু বুঝতে হলো তোমার প্রয়োজন ভালোবাসা’
‘এই পথ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা জানার চেষ্টা করা অর্থহীন। তুমি শুধু প্রথম ধাপটি নিয়ে চিন্তা করো, পরেরগুলো এমনিতেই চলে আসবে।’
‘ পৃথিবীটা সুউচ্চ পর্বতের মতন, এখানে প্রতিধ্বনি নির্ভর করে তোমার উপরেই। তুমি যদি ভালো কিছুর জন্য চিৎকার করো, পৃথিবীও তোমাকে তেমন প্রতিদান দিবে। তুমি যদি খারাপ কথা বলে চিৎকার দাও, সে তোমাকে তেমনই ফেরত দিবে। কেউ যদি তোমার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলে, তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বলো। পৃথিবীকে বদলে দিতে তোমার হৃদয়কে বদলে দাও’
‘আমার জীবনটা পুরো উলটে যাবে- মনে করে দুঃশ্চিন্তা করতে যাবেন না। আপনি কী করে জানেন, সেই ওলটানো জীবন এই সোজা অবস্থাটির চেয়ে ভালো হবে না?’
‘জীবনে তোমার যা-ই হোক না কেন, কখনো হতাশ হয়ে পড়ো না। এমনকি সবগুলো দরজাও যদি বন্ধ হয়ে যায়, একটি গোপন পথ তুমি খুঁজে পাবে যার হদিস কেউ জানেনা। তুমি হয়ত এখনো দেখতে পাচ্ছ না, কিন্তু এই পথের শেষে জান্নাতের অনেকগুলো বাগান আছে। কৃতজ্ঞ হও! তুমি যা চাও তা পাওয়ার পর শুকরিয়া করা তো সহজ, বরং যা চাইছ তা পাওয়ার আগেই শুকরিয়া কর’।
‘তুমি কি ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছ জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে? অথচ তোমার বর্তমানের মাঝেই রয়েছে সেগুলো। যখন তুমি কোন চুক্তি, যুক্তি আর প্রত্যাশা ছাড়াই ভালোবাসতে পারবে, তখন তুমি জান্নাত খুঁজে পাবে। যখন তুমি ঘৃণা আর মারামারিতে জড়িয়ে থাকবে, তুমি খুঁজে পাবে জাহান্নাম’
‘আল্লাহর বান্দারা তো কখনো ধৈর্যহারা হয় না। কেননা সে তো জানেই যে সদ্য প্রকাশিত বাকা চাঁদটির পূর্ণিমার চাঁদে পরিণত হতে সময় লাগবে’
‘ভালোবাসা ছাড়া জীবন হলো স্রেফ আবর্জনার মত’।
‘আমি কি আত্মিক, নাকি বস্তুগত, নাকি শারীরিক ভালোবাসার দিকে মন দিবো?এসব প্রশ্ন করতে যেও না। বৈষম্য তো কেবল বৈষম্যেরই জন্ম দেয়। ভালোবাসার জন্য এসব নানান রকম নাম, বিভাজন অথবা সংজ্ঞার প্রয়োজন নেই। হয় তুমি ভালোবাসার মাঝেই আছ, একদম কেন্দ্রে। নতুবা এই পরিসীমার বাইরে তুমি আছ, এই দুরত্বের হাহাকার বুকে নিয়ে।’
‘জীবনে তোমার যা-ই হোক না কেন, কখনো হতাশ হয়ে পড়ো না। এমনকি সবগুলো দরজাও যদি বন্ধ হয়ে যায়, একটি গোপন পথ তুমি খুঁজে পাবে যার হদিস কেউ জানেনা। তুমি হয়ত এখনো দেখতে পাচ্ছ না, কিন্তু এই পথের শেষে জান্নাতের অনেকগুলো বাগান আছে। কৃতজ্ঞ হও! তুমি যা চাও তা পাওয়ার পর শুকরিয়া করা তো সহজ, বরং যা চাইছ তা পাওয়ার আগেই শুকরিয়া করো।’
‘তুমি কি ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছ জান্নাত-জাহান্নাম দেখতে? অথচ তোমার বর্তমানের মাঝেই রয়েছে সেগুলো। যখন তুমি কোন চুক্তি, যুক্তি আর প্রত্যাশা ছাড়াই ভালোবাসতে পারবে, তখন তুমি জান্নাত খুঁজে পাবে। যখন তুমি ঘৃণা আর মারামারিতে জড়িয়ে থাকবে, তুমি খুঁজে পাবে জাহান্নাম।’
নিভৃতচারী ও নির্জনতার কবি এমিলি ডিকেনসন